অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে টাকা কামানোর নেশায় মেতেছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ নেতৃবৃন্দ। ওষুধ কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেয়া, বিদেশি ছাত্রদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা নেয়াসহ বছরে তাদের আয় প্রায় দু’কোটি টাকা। আর এ টাকা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে চরম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে,অভিযোগের তীর সংগঠনের সভাপতি সাইফুদ্দিন আহম্মেদ খান শিহাবের দিকে। তিনি ওষুধ কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে সরকারি কোনো ওষুধ লেখেন না। তিনি ও তার মনোনীত ২৩ জনসহ মোট ২৪ জন ইন্টার্ন চুক্তিবদ্ধও হয়েছেন ওষুধ কোম্পানিগুলোর সাথে। বিদেশি যেসব ছাত্র যশোর জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্নি করতে আসছেন তাদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক নেয়া হচ্ছে টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক শিহাব।

ওষুধ কোম্পানির টাকায় পিকনিক করতে না পারা অন্যান্য ইন্টার্নদের দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এই ঘটনা সামনে এসেছে। যেটিকে খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনৈতিক বলে দাবি করেছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগে জানা গেছে, যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সাইফুদ্দিন আহম্মেদ খান শিহাবসহ ২৪ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক আটটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। তারা প্রতিজনে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক দুই লাখ টাকা করে পান। এজন্য তারা হাসপাতালের রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে সরকারি ওষুধ না লিখে ওইসব কোম্পানির ওষুধ লেখেন। এতে রোগীর স্বজনেরা বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হন। এছাড়া, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কোনো রোগীকে রেফার করতে না পারলেও যশোর জেনারেল হাসপাতালে ঘটছে তার উল্টো। এই হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হরহামেশা রোগীদের অন্যত্র রেফার করছেন। দিচ্ছেন ছাড়পত্রও। আবার সেই রোগীর ব্যবস্থাপত্রে (প্রেসক্রিপশান) চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিগুলোর ওষুধ লেখা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত অসংখ্য প্রমাণ গ্রামের কাগজের কাছে সংরক্ষিত আছে।

অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, বিদেশি যে ১৫ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন তাদের মধ্যে ১৪ জনের কাছ থেকে শিহাব ও তার সঙ্গীরা ৫০ হাজার টাকা করে আদায় করেন। যশোরের এক শীর্ষ নেতার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার সুবাদে একজন বিদেশির কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়া হয় না। এসব বিদেশি ইন্টার্ন টাকা না দিলে তাদেরকে কোনো টিউটি বা ক্লাস দেয়া হয় না।

অভিযোগকারী ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বলেছেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে ৫৯ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন। ওষুধ কোম্পানি বা অন্যান্য উৎস থেকে আদায় করা অর্থ ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের ফান্ডে জমা হওয়ার কথা। এই টাকা দিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের প্রতি বছর পিকনিকে যাওয়ার কথা। চলতি বছরে সবারই সিলেটে পিকনিকে যাওয়ার কথা ছিল। যা করোনা ও সিলেটাঞ্চলের বন্যার অজুহাতে বাতিল করেন সভাপতি সাইফুদ্দিন আহম্মেদ খান শিহাব। তবে, তিনি ৩৬ জন ইন্টার্নকে বাদ রেখে অনুগত ২৩ জনকে নিয়ে সিলেটে পিকনিকে গেছেন। হাসপাতাল থেকে অবশ্য ছুটি নিয়েছেন খুলনায় যাওয়ার কথা বলে। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন শিহাব নিজে। এসব ঘটনায় যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে যারা টাকার ভাগবাটোয়ারা থেকে বা অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা ফুঁসে উঠেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আক্তারুজ্জামানের কাছে অভিযোগ করেছেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নিজস্ব ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের বেশ কিছু স্ক্রিনশর্ট অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। দৈনিক গ্রামের কাগজ অফিসে যা সংরক্ষিত আছে। এসব স্ক্রিনশর্টে রোগীদের কোন কোন ওষুধ দিতে হবে, কোন বেসরকারি হাসপাতালে সিটিস্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা করানোর জন্য রোগী পাঠাতে হবে, কোন ওষুধ কতদিন প্রেসক্রাইব করতে হবে, কোন ফ্লোরে নির্দিষ্ট দিনে কোন ওষুধ লিখতে হবে তার নির্দেশনা দেয়ার তথ্য রয়েছে। এসব নির্দেশনা না মানলে সে ব্যাপারে সভাপতির ক্ষোভ প্রকাশের স্ক্রিনশর্টও গ্রামের কাগজের কাছে এসেছে।

অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, যশোর জেনারেল হাসপাতাল ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদটি অর্থ কামানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে। যারা এই পদে আসেন তারাই ওষুধ কোম্পানি, বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রিএজেন্ট কোম্পানির সাথে অনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। বিদেশি ইন্টার্নদের ওপর নানা খড়গ চাপিয়ে আদায় করেন অর্থ। চলতি ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের জন্য পরিষদের সভাপতি মনোনীত হয়ে সাইফুদ্দিন আহম্মেদ শিহাব টাকা কামানোর জন্যে হয়ে উঠছেন বেপরোয়া। এজন্য তিনি দলে ভিড়িয়েছেন আরও ২৩ জনকে। যারা শিহাবে নির্দেশিত পথেই চলেন। আদায় অর্থের থেকে একটি অংশও তারা পেয়ে থাকেন।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি ইন্টার্নদের কাছ থেকে যে টাকা আদায় করেন শিহাব তার একটা অংশ পান হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মনিরুজ্জামান ও ক্যাশিয়ার ইসরাফিল। তারা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, যদি কেউ বিদেশি ইন্টার্নদের কাছ থেকে নিয়ে থাকেন তাহলে তার দায়ভার তিনিই বহন করবেন।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আখতারুজ্জামান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, টাকা নেয়ার অভিযোগ থাকায় এ বছর কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্নিতে নেয়া হয়নি। ৩৬ জনের স্থলে ২৪ ইন্টার্নের পিকনিকে যাওয়ার বিষয়টি জানেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিকনিকে যাওয়ার জন্যে টাকার প্রয়োজন আছে। সে কারণে সামান্য টাকা নিতে পারে। কিন্তু, চুক্তিবদ্ধ হয়ে যদি কেউ নিয়ে থাকে তাহলে ঠিক করেনি। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তত্ত্বাবধায়ক।

KKHC 2

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ন পরিষদের সভাপতি অভিযুক্ত সাইফুদ্দিন আহম্মেদ শিহাব। মোবাইলে তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি গ্রামের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা ডাক্তারদেরকে তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখতে অনুরোধ করেন। আমাদেরকেও সে ধরনের অনুরোধ করা হয়। এজন্য তাদের কাছ থেকে মাসিক কোনো টাকা নেয়া হয় না। প্রতি বছর পিকনিকে যাওয়ার সময় বিভিন্ন কোম্পানিগুলো অন্যদের মতো আমাদেরকেও সহযোগিতা করে। এর বাইরে কিছু না’।
সূত্রঃ গ্রামের কাগজ